চট্টগ্রাম নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহার (ভিডিও সহ)

0
393

বাংলাদেশের বৌদ্ধদের অন্যতম পূণ্যস্থান হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার।

১৯০৩ সালে আন্দরকিল্লা রংমহল পাহাড়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের জন্য মাটি খননকালে একটা পুরোনো বুদ্ধ মূর্তি পাওয়া যায়।

বিহারের সে সময়ের অধ্যক্ষ অগ্গমহা পন্ডিত উ–ধম্মবংশ মহাথেরের তৎপরতায় মূর্তিটি বঙ্গীয় সরকার এ বিহারে প্রদান করে।

বিহারের মূল ভবনটির পাশেই অপর একটি মন্দিরে এই মূর্তিটি স্থাপন করা হয়। এটি “বুড়াগোঁসাই মন্দির” নামে পরিচিত।
১৮৮৯ সালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি এই বিহারটি প্রতিষ্ঠা করে। এই বিহারের রয়েছে শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির (তৎকালীন চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি) প্রথম সভাপতি শ্রীমৎ উ. গুনামেজু মহাথের এবং সাধারণ সম্পাদক নাজিরকৃষ্ণ চৌধুরী বিহার স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। প্রাথমিকভাবে ভক্ত এবং পূজারীদের আর্থিক সহযোগিতায় ভবনটির একতলা নির্মিত হয়।
২০০৫ সালে বিহারে প্রবেশের দুই পাশে অধ্যক্ষ শ্রীমৎ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাথের এবং অধ্যক্ষ অধ্যাপক শীলাচার শাস্ত্রী মহাস্থবিরের স্মৃতিমন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এছাড়াও বিহারের মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় গৌতম বুদ্ধের আসনের নিচে দুইপাশে পন্ডিত-উ-ধম্মবংশ মহাথের এবং শ্রীমৎ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাথের এর আবক্ষ মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে।
বর্তমানে থাইল্যান্ড থেকে আনা গৌতম বুদ্ধের দুই প্রধান শিষ্য অগ্রশ্রাবক ধর্ম সেনাপতি ‘সারিপুত্র’ এবং ঋষিশ্রেষ্ঠ ‘মহামোগলায়ন” মহাস্থবিরের

অষ্টধাতুর নির্মিত মূর্তি বুড়া গোঁসাই মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছে বলে জানা যায়।
বৌদ্ধ সমিতির নেতৃস্থানীয় থেকে জানা যায়, ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ শাস্ত্রে পন্ডিত উ. গুনামেজু মহাস্থবির ও বৌদ্ধ সমাজের অবিসংবাদিত নেতা নাজির কৃষ্ণচন্দ্র চৌধুরীর নেতৃত্বে

তৎকালীন সমাজ সচেতন ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি (আজকের বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সমিতির অস্থায়ী কার্যালয় চট্টগ্রাম শহরের তামাকুন্ড়ুলি লেনে।

১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে তামাকুমন্ডী লেন অস্থায়ী কার্যালয়ে উ. গুনামেজু মহাস্থবিরকে বিহারাধ্যক্ষ নির্বাচিত করে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করে বিহারের কার্যক্রম শুরু করেন।

১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে নাজির কৃষ্ণচন্দ্র চৌধুরী পরলোক গমন করলে বৌদ্ধ নেতা জেলডাক্তার ভগীরথ চন্দ্র বড়ুয়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে উ. গুনামেজু মহাস্থবির পরলোক গমন করলে বৌদ্ধরত্ন হরগোবিন্দ মুৎসুদ্দি সমিতির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

পদাধিকারবলে জেলডাক্তার ভগীরথ চন্দ্র বড়ুয়া চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সম্পাদক ছিলেন।

তাঁর নেতৃত্বে স্থায়ীভাবে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার নির্মাণের জন্য ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে এক কানি পাঁচ গন্ডা জমি ক্রয় করে ক্রয়কৃত জমিতে ধীরে ধীরে বিহার নির্মাণ করেন।
গৌতম বুদ্ধের কেশধাতু : 

জানা যায়, চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের সংগ্রহে রয়েছে এক মহামূল্যবান নির্দশন। আর তা হলো, গৌতম বুদ্ধের কেশগুচ্ছ।

এর কিছু অংশ আবার এখান থেকেই সরকারিভাবে থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা ও জাপানে সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয়।

ত্রিশের দশকে আচার্য শাক্য লামা নামে তিব্বতের এক সন্ন্যাসী চট্টগ্রাম ভ্রমণে আসেন।

তিনি কিছুদিনের জন্য বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করেন এবং বিহারের অধ্যক্ষ অগ্গমহাপন্ডিত–উ–ধম্মবংশ মহাথেরকে বুদ্ধের কেশধাতু প্রদান করেন।

অতি দুর্লভ এই কেশধাতুর কিছু অংশ ১৯৫৮ সালে শ্রীলংকায়, ১৯৬৪ সালে জাপানে, ১৯৭৯ সালে থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদান করা হয়।

শ্রীলংকার সরকার ২০০৭ সালে আবারো বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে বৌদ্ধ সমিতি থেকে কেশধাতু গ্রহণ করে।

প্রতি বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার সময়ে গৌতম বুদ্ধের কেশধাতু সর্ব সাধারণের দর্শনের জন্য খুলে দেয়া হয়।

বিহারের ভেতরে একপাশে একটি বিশাল গাছের নিচে নির্মাণ করা হয়েছে বোধিমন্ডপ।

বৃত্তাকার এই মন্ডপের চারপাশে রয়েছে ছোট ছোট বুদ্ধ মূর্তি।

পূর্ণাথীরা মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থণা করেন সেখানে।

জানা যায়, শ্রীলংকার সরকারের দেয়া গৌতম বুদ্ধের স্মৃতিধন্য বোধিবৃক্ষের একটি চারা ১৯৮০সালের ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে রোপণ করা হয়।

বোধিবৃক্ষের চারাটি শ্রীলংকার অনুরাধাপুর থেকে পাঠানো হয়।
ছোট বুদ্ধ মূর্তিগুলো পাওয়া যায় কর্ণফুলী থানার জুলধা বড় উঠান ইউনিয়নে পুকুর খননের সময়ে মাটির নিচে পাওয়া যায়। সেখান থেকে এগুলো সংগ্রহ করে আনা হয়।
চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে বিভিন্ন দূর্লভ পাণ্ডুলিপি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার আছে।

এটির নাম চিন্তামনি গ্রন্থাগার। এখানে তালপাতার পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে।

এই সংগ্রহশালায় পালি ভাষা, বর্মী ভাষা, সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীন ধর্মীয় শাস্ত্র রয়েছে।

শাস্ত্রীয় সাহিত্য এবং তালপাতায় রচিত শিল্পকর্ম গ্রন্থাগারকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছে।

সংকলিত : দৈনিক পূর্বকোণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here