দরিদ্র এক পুণ্যবান ব্যক্তি। গুড়, দধি বিক্রয় করে যিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। একদিন বাজারে যাওয়ার সময় মধুপূর্ণ মৌচাক দেখতে পেয়ে তা সংগ্রহ করে সুকৌশলে মধু সংগ্রহ করে বিক্রয় প্রত্যাশায় বাজারের দিকে অগ্রসর হলেন। পথিমধ্যে কিছু লোক উনার মধুসমেত পাত্রটি চড়া দামে ক্রয়ের জন্য সম্মত হলেন। সেই পুণ্যবান ব্যক্তি ভাবলেন কি ব্যাপার- উনারা এত দামে মধু কিনে কি করবেন? জিজ্ঞেস করলে ক্রেতারা- “বিপস্সী বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্খুসংঘকে দান করবেন বলে ব্যক্ত করলেন”। তখন তিনি টাকার বিনিময়ে মধু বিক্রি না করে নিজ হাতেই “বিপস্সী’’ বুদ্ধকে দান করে দিলেন। চিন্তা করেনি নিজে কি খাবেন! সেই দানের মহাফল আর পদুমুত্তর বুদ্ধ হতে বর প্রাপ্ত হয়ে তিনি হলেন গৌতম বুদ্ধের সময়ে “লাভীশ্রেষ্ঠ সীবলী স্থবির”।

সীবলী স্থবির এর পরিচয়

ভারতের সমৃদ্ধ নগরী ‘বৈশালী’র লিচ্ছবি রাজ্যের রাজপুত্র মহালী কুমার। অন্যদিকে কোলীয় রাজকন্যা পরমা সুন্দরী সুপ্রবাসা। অতীতের কর্মসূত্রে এ দুই রাজপুত্র-কন্যা মণি-কাঞ্চনের মত পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। যেদিন সুপ্রবাসা গর্ভবতী হল সেদিন হতেই তার গর্ভজাত সন্তান মহাপূণ্যবান তা উপলব্ধি করল। কেননা সেদিন হতে তিনি নানা উপঢৌকন, রাশি রাশি অর্থ, বস্ত্রালংকার এবং নানা প্রকার ঈস্পিত-মনোজ্ঞ বস্তুসামগ্রী তিনি লাভ করতে লাগলেন। রাজা-রাণীর রাজপরিবার ধন-দৌলতলতে পরিপূর্ণ হতে লাগল। এমনকি সুপ্রবাসাকে স্পর্শ করে কৃষক বীজ বপন করতঃ একবীজ হতে নাল জন্মে শত শত। সুপ্রবাসার হস্তস্পর্শে চাষীরা গোলাতে শস্য উঠালে, শস্য খরচ করার পরও গোলা পূর্ণ থাকত। অভূতপূর্ব-অকল্পনীয় এ দৃশ্যে সবাই জ্ঞাত হল যে, সুপ্রবাসার গর্ভপুত্র যেন স্পর্শমনি!

রাজ্যের চতুর্দিকে আনন্দের সাড়া আর রাজা-রাণী পুত্র প্রেমে হলো মাতোয়ারা। সবাই অধির আগ্রহে রাজার নন্দনের জন্মক্ষণ গণনায় ব্যাকুল। ক্রমে ক্রমে দশমাস দশদিন গত হবার পরও রাজপুত্রের জন্ম হল না! সবাই বিষ্ময়ে হতবাক! এরূপে সাত বছর গত হবার পর রাণী সুপ্রবাসা প্রসব বেদনা অনুভূত করতে লাগলেন। অতঃপর সুপ্রবাসা মহাকারুণিক বুদ্ধের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে রাজপুরীতে আনন্দের বন্যা বয়ে সাত বছর সাতদিনে রাজপুত্র জন্মগ্রহণ করেন। পুত্রমুখ দর্শনে রাণীর সমস্ত যন্ত্রণা দূর হল। অন্তর অপার পুত্রপ্রেমে প্রফুল্ল হল। রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ল আনন্দোল্লাস।

চারদিক সুশোভিত হল রাজপুরী। নৃত্য-গীত ধ্বনিতে রাজ্য যেন স্বর্গপুরী। আয়োজন করা হল দাল শালা। অকাতরে দানধর্ম চলছিল। ইষ্ট-মিত্র, জ্ঞাতিগণ সকলে সমবেত হলেন। সকলেই রাজকুমারকে এক নয়ন দেখার জন্য সানন্দে অধির অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে রাজকুমারের দর্শন মিলল। রাজকুমারের এমন সুবর্ণ ন্যায় মুখ দেখে সকলের মনপ্রাণ যেন সুশীতল। এ হেতু নাম রাখা হয়- সীবলী কুমার।

প্রব্রজ্যাধর্মে দীক্ষা এবং অর্হত্বলাভ

রাজা-রাণীর আরাধনায় মহাকারুণিক বুদ্ধ, সারিপুত্র স্থবিরসহ সশিষ্যে রাজপ্রসাদে এসে উপস্থিত হলেন। তথায় বুদ্ধকে বন্দনা-পূজা সমাপন করে মাতা-পুত্রে সারিপুত্র স্থবিরকে বন্দনা করার প্রত্যয়ে স্থবিরের নিকটে উপস্থিত হলেন। সারিপুত্র স্থবির সীবলী কুমারকে উপলক্ষ করে জিজ্ঞাসা করলেন- কুমার, তোমার সপ্তবর্ষ গর্ভবাস যন্ত্রণার কথা মনে আছে কী? কুমার প্রতুত্তরে বললেন- ভন্তে, অসহ্য অনন্ত দুঃখ গর্ভ কারাগার, লৌহকুম্ভী নরকের চেয়ে মাতৃগর্ভ কম কিছু নয়। তারপর সারিপুত্র স্থবির প্রকাশ করলেন- সজ্ঞানে তুমি জন্ম দুঃখ অবগত হয়েছ! নিরোধ নির্বাণ ব্যতীত সুখ নেই। তোমার প্রব্রজ্যা ইচ্ছা আছে কী? কুমার সবিনয়ে বললেন- ভন্তে, আমি প্রব্রজ্যাই গ্রহণ করব। ইহা ব্যতীত দুঃখ মুক্তি আর দেখি না। সপ্তম বর্ষীয় কুমারের এরূপ পরিপক্ষ জ্ঞান-ধর্মালাপে সুপ্রবাসা আনন্দিত হয়ে সারিপুত্র স্থবিরকে জিজ্ঞাসা করলেন- ভন্তে, আপনাদের আলাপচারিতা কী নিয়ে? তখন সারিপুত্র স্থবির ব্যক্ত করলেন- দুঃখ সত্য প্রসঙ্গে আমাদের এ আলাপচারিতা। এবং কুমার ইচ্ছা পোষণ করছে প্রব্যজ্যা গ্রহণে! কিন্তু অনুমতি ব্যতীত কেমন করে প্রব্রজ্যা প্রদান করব!

ইহা শুনে সুপ্রবাসা সারিপুত্র স্থবিরকে বন্দনা নিবেদন করতঃ কুমারকে প্রব্রজ্যা প্রদান করার অনুমতি প্রদান করলেন। তখন বুদ্ধ সশিষ্যে সীবলী কুমারকে সাথে নিয়ে বৈশালী বিহারে উপস্থিত হয়ে প্রব্রজ্যা প্রদানের ব্যবস্থা করলেন। সারিপুত্র স্থবির আদি কর্মস্থান দিতে গিয়ে কুমারকে উপলক্ষ করে বললেন- হে কুমার, তুমি সপ্তবর্ষ গর্ভবাস যন্ত্রণা ভোগের কথা স্মরণ কর! সীবলী কুমার গর্ভবাস যন্ত্রণার নরকসম দুঃখের কথা স্মরণ করতে লাগলেন। এমতাবস্থায় মস্তক মুণ্ডনকালে চুলের প্রথম গোছা কর্তন করার সময় কেশ কেশ ভাবনাতে কুমার স্রোতাপন্ন হন, চুলের দ্বিতীয় গোছা কর্তন শেষে মার্গফল লাভ করলেন, তৃতীয় গোছাতে কুমার অনাগামী ফলে প্রতিষ্ঠিত হলেন এবং সর্ব কেশ ছেদন শেষে কোন প্রকার ক্লেশ আর অবশিষ্ট রইল না। তিনি অর্হত্ব ফল লাভের মধ্যদিয়ে দুঃখ জয়ে সমর্থ হলেন।

তদবধি ভিক্খুদের অভাব ঘুচিল, ভৈষজ্য-চীবর আদি চতুর্প্রত্যয়, অজস্র করিছে দান দেবনরচয়। রাশি রাশি খাদ্যভোজ্য সংখ্যা নাহি তার, দেখিয়া বিষ্ময় লাগে মনে সবাকার। যেদিকে সীবলী থের করেন গমন, বৃষ্টিধারা সম দান হয় বরিষণ।

সপ্তবর্ষ গর্ভবাসের কর্মফল বর্ণনা

অতীতের কর্ম্মশক্তি থাকে সুপ্তাকারে, সকলেই কর্ম্মতত্ত্ব বুঝিতে না পারে। আম্র হতে আম্র জন্মে, কাঠাঁলে কাঠাঁল, নিম হতে জন্মে নিম, মাকালে মাকাল*। তাই বলি কর্ম্মফলে হও সাবধান, কর সুচরিত কর্ম্ম হয়ে মতিমান। ভাল কর্ম্মে ভাল ফল, মন্দে মন্দ হয়, কর্ম্মের প্রকৃতি ইহা জানিবে নিশ্চয়।

সুদূর অতীতে বারাণসীতে ব্রহ্মদত্ত নামে এক অধিপতি ছিলেন। তিনি উত্তমরূপে রাজধর্ম পালন করতেন। রাজ্যে তার সুখ্যাতি প্রত্যেক প্রজামুখে। কিন্তু অতর্কিতভাবে একদিন শত্রুরাজ দ্বারা বারাণসীতে আক্রমণ হল। শত্রুরাজ রাজা ব্রহ্মদত্তকে হত্যা করে বারাণসীর সিংহাসন দখল করে নিলেন। এবং পূর্ব রাজরাণীকে অগ্র মহিষীরূপে ভূষিত করলেন।

এদিকে রাজা ব্রহ্মদত্তের পুত্র গুপ্তদ্বার দিয়ে পলায়ন করে প্রাণ রক্ষা করলেন। তিনি দূরদেশী জ্ঞাতিকুলে আশ্রয় নিয়ে ধীরে ধীরে সৈন্য সংগ্রহ এবং নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন। অতঃপর, সৈন্যসহ পিতৃরাজ্য পুনরুদ্বারে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়ে বারাণসীর দিকে রওনা হলেন। গোপন সংবাদে মা পুত্রের আগমন বার্তা পেয়ে গোপন সংবাদ প্রেরণ করেন-

“আগে বন্ধ কর নগরের বহির্দ্বার,

খাদ্যের অভাবে কষ্ট হোক সবার। ন

গরবাসীরা যবে অতিষ্ঠ হইবে,

ক্রোধে তারা শত্রুরাজে মারিয়া ফেলিবে।

তাহা হলে বিনাযুদ্ধে লভিবে বিজয়,

ইহাই উত্তম যুক্তি জানিও নিশ্চয়”।

মায়ের বার্তা পেয়ে নগরের বাইরের দরজা সৈন্যদল দিয়ে সাত বছর অবরুদ্ধ করা রাখা হয়। তবুও রাজ্যের মধ্যে খাদ্যের অভাব, হাহাকার উঠেনি। কারণ নগরবাসীরা গুপ্তদ্বার দিয়ে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে আনত। তখন পুনরায় মায়ের সংবাদে গুপ্তদ্বার অবরোধ করা হলে নগর মাঝে খাদ্যদ্রব্যের হাহাকারে প্রজাসাধারণ অতিষ্ঠ হয়ে রাজাকে হত্যা করে। অতপরঃ রাজা ব্রহ্মদত্তের পুত্র পিতৃরাজ্য নিজের করে নিলেন। (রাজা ব্রহ্মদত্তের সেই রাজপুত্র ছিলেন ‘সীবলী কুমার’)।

সপ্তবর্ষ সপ্তদিন দ্বার রুদ্ধ করি,

সেই পাপে লৌহকুম্ভী নরকেতে পড়ি।

ভুগিয়াছি, বহু দুঃখ না যায় বর্ণন,

অবশেষে লভিয়াছি মানব জনম।

ভুগিয়াছি পাপের ফল কিছু বাকী ছিল,

সে কারণে মাতৃগর্ভে এত কষ্ট হল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here