Skip to main content

উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার নাম সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের


বাংলাদেশে বসবাসরত বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু শুদ্ধানন্দ মহাথের 
আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ মনীষা, মানবতাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু, অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক-বাহক, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি এবং ঢাকার সবুজবাগের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের মহাধ্যক্ষও ছিলেন তিনি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহু সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি ছিলেন মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরর সুযোগ্য শিষ্য। তাঁর সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড শুধু বৌদ্ধ সম্প্রদায় নয়, সমগ্র দেশের মানুষের জন্য সম্মান, কল্যাণ ও মঙ্গলজনক ছিল।
পৃথিবীতে কালে কালে ধর্মীয় প্রবক্তাদের আগমনে পৃথিবী সুখময়, শান্তিময় সর্বোপরি স্বস্তিময় হয়ে ওঠে। তাঁদের নিরলস শ্রম, মেধা, সেবায় সমাজ এগিয়েছে বহুদূর আর বিকশিত হয়েছে সভ্যতা-কৃষ্টি। এমনকি মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন-ঐক্য সুদৃঢ়করণে তথা মৈত্রী সুপ্রতিষ্ঠিতকরণে তাঁদের রয়েছে অনন্যসাধারণ অবদান। এ দেশে যে কজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের আগমন হয় সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
তিনি গত ৩ মার্চ মঙ্গলবার ঢাকার ধানমণ্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালে ৮৮ বছর বয়সে সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে এ দেশের মানুষ শুধু একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হারায়নি, হারিয়েছে একজন মানবতাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষুকে। তাঁর মৃত্যুতে যে ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁকে হারিয়ে এ দেশের হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবাই আজ শোকাহত। ব্যথায় ব্যথিত।


 সৃষ্টি ও সেবা করা যেন তাঁর ধর্ম ও কর্ম। আর্তপীড়িতের সেবা, মানবকল্যাণ ও জ্ঞান বিতরণই তাঁর একমাত্র ব্রত এবং ধ্যান-জ্ঞান। শিক্ষা বিস্তারে তিনি একে একে তৈরি করেন পদুয়ার ডিগ্রি কলেজ, পদুয়া বালিকা বিদ্যালয়, অগ্রসার বালিকা বিদ্যালয়, করল বালিকা বিদ্যালয়, ধর্মরাজিক উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অসংখ্য সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। তিনি অগণিত এতিমের অভিভাবক আর আর্তপীড়িতের একমাত্র বন্ধু। পূর্ণিমা, ঈদ ও পূজায় তাঁর অসাম্প্রদায়িক বিচরণ ছিল সহজাত প্রবৃত্তি। প্রতিবছর রোজার সময় তিনি ইফতার বিতরণ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, যা সবাইকে সম্প্রীতি-সদ্ভাব সংরক্ষণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করতেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিহারটির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি অসীম সাহসী যেমন ছিলেন, তেমনি আবার মানবিকও ছিলেন বটে। মুক্তিযুদ্ধকালীন জীবনযাপন আতঙ্কময় ছিল। এ সময় তিনি অসম সাহসিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী পীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন। মানবিকতায় নিজেকে পরার্থে উৎসর্গ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। তিনি অতি সতর্কতার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের প্রাণ রক্ষা করেন। একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়।
তিনি ছিলেন সাংগঠনিক ও মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ত্রিকালের সাক্ষী তিনি, ত্রিকালকে ধারণ করেন আপন মহিমায়। ত্রিকালের কর্ম-অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তাঁর সৃষ্টি। সৃজনশীলতার সাধনায় আত্মমগ্ন এই ঋদ্ধ পুরুষ বহুগুণে গুণান্বিত। তিনি আজীবন ব্রহ্মচর্যা পালনকারী লোভ-দ্বেষ-মোহহীন এবং নিরহংকারী একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু। তিনি দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য সম্মাননা, স্মারক ও পদকে ভূষিত হন। সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তিনি ২০১২ সালে একুশের পদকে ভূষিত হন।
সম্প্রীতি-সদ্ভাব সমৃদ্ধিকরণে কিংবা আন্তর্ধর্মীয় সংহতি রক্ষায় সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী সম্প্রীতির বলিষ্ঠ সেনাপতি একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু, যাঁর খ্যাতি ছিল বিশ্বব্যাপী। বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাকরণেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তাশীলতা, প্রজ্ঞা ও মননশীলতা সবাইকে আকৃষ্ট করে। এ অবস্থায় তাঁর কর্মকীর্তির জন্য তিনি দেশের সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অন্যতম একজন শান্তির দূত।
 শান্তির বাণী নিয়ে তিনি ভ্রমণ করেন চীন, জাপান, কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, ভারত, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুর, হংকং, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডসহ ৮০টি দেশ। তা ছাড়া শতাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করেন। বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ কর্মবহুল জীবন তাঁকে উপনীত করেছে বৌদ্ধ সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু সংঘনায়কের আসনে।
সব শেষে বলি—
‘নয়ন সম্মুখে তুমি নাই
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।
লেখক :

ড. বিমান চন্দ্র বড়ুয়া

অধ্যাপক ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান-পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সদস্য—সম্প্রীতি বাংলাদেশ


Comments

Popular posts from this blog

পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া হলো না অ্যানি বডুয়ার

পিএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে বাসা থেকে বের হন তিনি। পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডে সহকর্মীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ দেয়ালের একটি অংশ এসে পড়ে তার ওপর। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় পটিয়ার সরকারি মেহেরআটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়ুয়ার (৪০)। রোববার (১৭ নভেম্বর) সকাল ৯টায় কোতোয়ালী থানাধীন পাথরঘাটায় গ্যাসের লাইনে বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে নিহতদের একজন তিনি। স্বামী পলাশ বড়ুয়া ও দুই ছেলে অভিষেক-অভিজিৎকে নিয়ে পাথরঘাটায় ভাড়া বাসায় থাকতেন অ্যানি বড়ুয়া। পলাশ বড়ুয়া পটিয়ার শিকলবাহায় পিডিবির প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। বড় ছেলে অভিষেক এ বছর জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোট ছেলে পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। পলাশ বড়ুয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আজকের পিএসসি পরীক্ষার প্রথম ডিউটিতে তাকে শাড়িও ঠিক করে দিয়েছি। পছন্দের শাড়ি পড়ে অ্যানি ডিউটিতে যাচ্ছিল। ও আগে বের হয়, আমি পরে বের হচ্ছিলাম। এরমধ্যে শুনি এ দুর্ঘটনা। আমাদের সাজানো গোছানো সংসার এক নিমিষেই শেষ। আমি ছেলেদের কি জবাব দেবো? অ্যানির শ্বশুর বাড়ি পটিয়ায়, বাবার বাড়ি কক্সবাজারের রামুতে। তার ভাই অনিক বড়ুয়া বলেন, আমার দুই ভাগ্নের কি হবে? তাদের কান্না থামছে না। শ…

সীতাকুন্ডের প্রথম নারী পুলিশ সুপার অনিন্দিতা বডুয়া

চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ডের কৃতি সন্তান প্রয়াত সরোজ কান্তি ও প্রয়াতা প্রতিমা বড়ুয়ার কণ্যা অনিন্দিতা বড়ুয়া সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রথম নারী পুলিশ সুপার হিসাবে কর্মক্ষত্রে দারুণ সফলতা পেয়েছেন। তার পিতা ব্যাংকার ও মাতা স্বনামধন্য অপর্ণা চরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। 
বুয়েট হতে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষে ২৪তম বিসিএসে ০২/০৭/২০০৫ সালে এএসপি হিসাবে যোগদান করেছেন।ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাষ্টার ৯ম এপিবিএন ২০১১'সালে ছিলেন। ২০১৩ সালে এডিসি বন্দর চট্টগ্রাম,২০১৪ সাল হতে এডিসি সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার এ অতি সুনামের সহিত কর্মরত রয়েছেন।      
 চাকরিজীবনে দেশে সফলতার পাশাপাশি জাতিসংঘ মিশনে যান ২০১০ সালে, ইতালিতে ট্রেনিং এ যান ২০১৮ সালে। উল্লেখ্য এসপি অনিন্দিতা বড়ুয়া সীতাকুণ্ড পৌরসভা এলাকার ২ নং ওয়ার্ডের সন্তান,ব্যক্তি জীবনে স্বামী রাজেশ তালুকদার সাথে রয়েছে একমাত্র পুত্র সন্তান রিসহাব বড়ুয়া তালুকদার।     
তারা তিন বোন বিসিএস ক্যাডার। সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে ও দারুণ জনপ্রিয় এই নারী এসপি।

পাথরঘাটায় বিস্ফোরণে নিহত ৭ ৷ এর মধ্যে একজন এ্যানি বডুয়া

চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় একটি বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে। এ ঘটনায় ৭ জন মারা গেছেন। দগ্ধ হয়েছেন অন্তত ২০ জন। রোববার সকাল ৯টার দিকে পাথরঘাটা ব্রিক ফিল্ড রোডের কুঞ্জমনি ভবনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এদের মধ্যে ৪ জন পুরুষ, দুইজন নারী ও এক শিশু রয়েছে। নিহতদের মধ্যে এ্যানি বডুয়া নামে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে, তিনি পটিয়ার এক স্কুলের শিক্ষক বলে পরিচয় পাওয়া গেছে ৷ স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের কুঞ্জমনি ভবনে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ভবনের একাংশ ভেঙে গেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস চারটি ইউনিট কাজ করছে। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।