ঐতিহাসিক রামু রাংকোট বৌদ্ধ বিহার

0
487

পূরাকীর্তি ও প্রত্নতাত্ত্বিক বৌদ্ধ নিদর্শনের পুণ্যভূমি কক্সবাজার। রামু হয়ে হাতের ডানপাশ ধরে চলে গেছে এক লেনের পাকা রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে শিকলঘাটা বেইলি সেতু পেরিয়ে রাজারকুল ইউনিয়ন। রাজারকুলেই অবস্থিত বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহাসিক রাংকুট (রাং-উ) বনাশ্রম মহাতীর্থ মহাবিহার।

বিহারের মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় উপাসনারত বুদ্ধের মূর্তি দেখে।

ফটকের ডানপাশে রয়েছে উপাসনারত ৩৫টি বুদ্ধ মূর্তি।

আর হাতের বামপাশে রয়েছে ৫০টি।

প্রায় ১৪’শ বছর আগে সপ্তম শতাব্দীতে চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাং-এর

ভারত ও বাংলাদেশে বুদ্ধের অবস্থানস্থল আবিষ্কারের সময়ে রোপিত ৩য় বটবৃক্ষটি রয়েছে মূল আশ্রমের পাশেই।

এই বটবৃক্ষের ছায়াতলে রয়েছে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ত্রিপিটক হাতে সম্রাট অশোক মহারাজার ২৩ ফুট উচু ভাস্কর্য।

বিশালাকৃতির শতবর্ষী বটবৃক্ষের পা-ঘেঁষে থরে থরে সাজানো সিঁড়িগুলো উঠে গেছে পাহাড়চূড়ায়। ওপরে উঠেই দেখা যায়, ছোট-বড় পাশাপাশি বুদ্ধমূর্তি।

যার একটি হচ্ছে মহাকারণিক গৌতম বুদ্ধের (বুড়া গোঁয়াই) মূর্তি।
প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, আরাকান সম্রাজ্যের দুই বণিক তপসসু ও ভল্লিক-এর ফাং (নিমন্ত্রণ) গ্রহণ করেছিলেন গৌতম বুদ্ধ।

এই দুই বণিক তাদের ফাং’য়ের কথা তৎকালীন আরাকান রাজা মহাচন্দ সুরিয়াকে জানান। রাজা খুশি হয়ে গৌতম বুদ্ধকে পুনঃনিমন্ত্রণ জানালে

তিনি তাঁর প্রধান শিষ্য আনন্দকে নিয়ে পদব্রজে এই দিক দিয়ে গমন করেন এবং বর্তমান এই মহাবিহারে স্থানে উপবেশন করেন (বিশ্রামের জন্য থামেন)।

এ প্রসঙ্গে ধন্যবতী রাজবংশ বইতে উল্লেখ আছে, গৌতম বুদ্ধ ধন্যবতীর রাজা চাঁদসুরিয়ার সময়ে সেবক আনন্দকে নিয়ে আরাকানের রাজধানী ধন্যবতী আসেন।

সেখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গৌতম বুদ্ধ আনন্দকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘হে আনন্দ, ভবিষ্যতে পশ্চিম সমুদ্রের পূর্বপাশে পাহাড়ের ওপর আমার বক্ষাস্থি স্থাপিত হবে।

এই জায়গার নাম হবে রাং-উ। ‘রাং’ অর্থ বক্ষ, আর ‘উ’ অর্থ অস্থি অর্থাৎ ‘রাংউ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘বক্ষাস্থি’।

ধারণা করা হচ্ছে ভাষার বিবর্তন হয়ে রাংউ থেকে রামু শব্দটি এসেছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোকজনের বিশ্বাস বর্তমানে রামুর রামকোট বৌদ্ধবিহারেই মহাকারণিক গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি স্থাপিত হয়েছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ২৬১ অব্দে সংঘটিত ইতিহাসের বিভীষিকাময় কলিঙ্গ যুদ্ধের সময় মানবতার ধ্বংস এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্রাট অশোকের মনে দারুণ রেখাপাত করে।

মানবসেবায় আত্মনিয়োগের জন্য বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে খৃষ্টপূর্ব ৩০৮ অব্দে এই মহাবিহার স্থাপন করেন।

সম্রাট অশোক সারা পৃথিবীতে ৮৪ হাজারটি এইরকম চৈত্য স্থাপন করেন, যা গৌতম বুদ্ধের ৮৪ হাজার ধর্মবাণীর স্মারক বহন করে। যার একটি বাংলাদেশে রামুতে অবস্থিত রাংকুট বনাশ্রম মহাতীর্থ মহাবিহার।
রামুতে ৩০টির মতো বৌদ্ধবিহার থাকলেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাংকুটের গুরুত্ব বেশি।

প্রচারপত্রে উল্লেখ আছে, ‘বিহারটি নির্মাণের পরবর্তী সময়ে এখানে ৭০০ বৌদ্ধ ভিক্ষু বসবাস করতেন। প্রাচীন চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণ কাহিনিতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

১৬৬৬ সালে মোগলদের আক্রমণে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায় ঐতিহাসিক রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহার।

ওই সময় বিহারটি ধ্বংসস্তূপ ও বন জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল।

মোগল আক্রমণের প্রায় ২৬৩ বছর পর ১৯২৯ সালে আবার নতুন করে বিহারটি আবিষ্কৃত হয়।’
১৯২৯ সালের দিকে বিহারের ধ্বংসাবশেষ দেখে তৎকালীন জগৎচন্দ্র মহাস্থবির নামের এক বৌদ্ধধর্ম সংস্কারক এটি পুনর্প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন।

ওই সময় রাংকুটের পাহাড়ের পাদদেশে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এবং প্রাচীন বুদ্ধমূর্তির অসংখ্য টুকরা পাওয়া যায়। স্থানীয় জমিদার মতিসিং মহাজনের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে জগৎচন্দ্র মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন।

সেই থেকে আবার রাংকুট বৌদ্ধবিহারে ব্যূহচক্র মেলা (পেঁচঘর), ৮৪ হাজার ধর্ম স্কন্ধ পূজাসহ নানা উৎসব উৎযাপন করা হয়।

তিনি আরও জানান, জগৎচন্দ্র মহাস্থবিরের অনুপ্রেরণায় বাংলা নববর্ষের বৈশাখ মাসের প্রথম দিকে সাত দিনের ব্যূহচক্র মেলার (পেঁচঘর) আয়োজন করা হতো।

যা পরবর্তীকালে রামকোটের মেলা নামে পরিচিতি লাভ করে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ,পূরাকীর্তি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এ বিহার এর গুরুত্ব সর্বাধিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here