আষাঢ়ী পূর্ণিমার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

0
535

আজ শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথি। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্যে এক স্মরণীয় দিন।

এ পূর্ণিমা তিথিতে রাজকুমার সিদ্ধার্থের মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ, গৃহত্যাগ,

সারানাথের ঋষি পতন মৃগদাবে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদের কাছে ভগবান বুদ্ধের ধর্মচক্র প্রবর্তনসূত্র দেশনা হয়েছিল।

একই তিথিতে শ্রাবস্তীর বৃক্ষমূলে প্রতিহার্য ঋষি প্রদর্শন, মাতৃদেবীকে ধর্মদেশনার জন্য তুষিতস্বর্গে গমন এবং ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস আরম্ভও হয়।
গৌতম বুদ্ধ যেমন নিজ প্রচেষ্টায় জীবনের পূর্ণতা সাধন করে মহাবোধি বা আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং জগজ্জ্যোতি বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত হন,

তেমনিভাবে পূর্ণচন্দ্রের মতো নিজের জীবনকে ঋদ্ধ করাই প্রতিটি বৌদ্ধের প্রচেষ্টা।

মহামানব গৌতম বুদ্ধের সময়ে দেখলেন, ভিক্ষুসংঘরা যেখানে সেখানে অবস্থান করে অযথা সময় নষ্ট করছে।

ভিক্ষুরা বর্ষাকালে চলাফেরা করতে গিয়ে বিভিন্নস্থানে কৃষকদের জমির ফসল ক্ষতি করায় কৃষকরা ভিক্ষুসংঘদের নিন্দা করতে লাগলো।

সে-সময়ে ভিক্ষুরা ভগবানের কাছে গিয়ে বর্ষাকালের সুবিধা অসুবিধার কথা উত্থাপন করলে ভগবান সেদিন থেকে ভিক্ষুসংঘদের বর্ষাব্রতের অনুমোদন সমর্থন করেছিলেন।

পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করেই গৌতম বুদ্ধের জীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
মায়াদেবীর মৃত্যুর পর বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী সিদ্ধার্থকে নিজ সন্তানের মত করে মানুষ করেন।

অত্যন্ত সুখে রাজকীয় ভোগ বিলাসে লালিত পালিত হতে থাকেন।
কুমার সিদ্ধার্থ একদিন নগর ভ্রমণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন রাজার নিকট।

রাজার অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে তিনি সারথী ছন্দককে নিয়ে নগর ভ্রমণে বের হয়ে প্রথম দিন লাঠিতে ভর করে চলমান এক বৃদ্ধ লোক, দ্বিতীয় দিন রোগ যন্ত্রণায় কাতর আর ও অধিকতর রুগ্ন বৃদ্ধ ব্যক্তি,

তৃতীয় দিনে আত্মীয় পরিজন ক্রন্দনরত এক মৃত ব্যক্তিকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং চতুর্থ দিনে ধীরস্থির শান্ত, সৌম্য কাষায় বস্ত্রধারী এক সন্যাসীকে দেখতে পেয়ে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন।
কুমারের অন্তরে বৈরাগ্য জ্ঞান সৃষ্টি হল।

মনের মধ্যে দারুণ ধর্ম সংবেগ উৎপন্ন হল।
এ দৃশ্য অবলোকনের পর তিনি ২৯ বৎসর বয়সে আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে কন্থক নামক তাঁর জন্মসঙ্গীর ঘোড়ায় চড়ে ছন্দক নামক আর একজন জন্মসঙ্গী সারথীকে নিয়ে অতি গোপনে রাতের অন্ধকারে কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেন।

অনেক পথ অগ্রসর হয়ে তিনি এক নদীর তীরে এসে উপস্থিত হন।
নদী তীরে এসে সারথী ছন্দককে জিজ্ঞাসা করলেন, এই নদীর নাম কি? ছন্দক উত্তর দিল।

কুমার সিদ্ধার্থ অনোমাকে নিমিত্তরূপে গ্রহণ করে ভাবলেন আনোমা, নোমা মানে মন্দ, আ মানে নয় অর্থাৎ মন্দ নয়।

সুতরাং এই স্থানেই তিনি তার সমস্ত রাজাভরণ খুলে ফেললেন, ক্ষুরধার তলোয়ার বের করে বাম হাতে তাঁর চুল ধরে ডান হাতে তা ছেদন করে অধিষ্ঠান করলেন আমি যদি বুদ্ধ হতে পারি তাহলে আমার এই কর্তিত চুল আকাশে উঠে যাবে, মাটিতে পতিত হবে না।

এই অধিষ্ঠান করে কর্তিত চুল আকাশে নিক্ষেপ করলেন।
বোধিসত্ত্বের মনের কথা দেবরাজ ইন্দ্র জানতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত চিত্তে স্বর্ণের ঝুড়ি করে উক্ত চুল তাবতিংস স্বর্গে নিয়ে গিয়ে চুলামণি জাদী নির্মাণ করেন।

দেবতারা সেই জাদীকে পূজা করছেন।
৩৫ বৎসর বয়সে আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে বারাণসীর ঋষিপতন মৃগদাবে ধর্মচক্র সূত্র প্রবর্তন করেন।

এক আষাঢ়ে পূর্ণিমায় গৌতম বুদ্ধ সিদ্ধার্থরূপে মাতৃগর্ভে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন। বর্ণিত আছে, কপিলাবস্তু নগরে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা সাড়ম্বরে উদযাপিত হতো।

এক আষাঢ়ী পূর্ণিমায় রাজা শুদ্ধোধনের মহিষী রানী মহামায়া উপোসথব্রত গ্রহণ করেন।

সে রাতে রানী মহামায়া স্বপ্নমগ্না হয়ে দেখলেন যে চারদিক থেকে পাল দেবগণ এসে পালঙ্কসহ তাকে নিয়ে গেলো হিমালয়ের পর্বতোপরি এক সমতল ভূমির উপর।
সেখানে মহামায়াকে সুউচ্চ এক মহাশাল বৃক্ষতলে রেখে দেবগণ সশ্রদ্ধ ভঙ্গিমায় এক পাশে অবস্থান দাঁড়িয়ে পড়ল।

এরপর দেবগণের মহিষীরা এসে মায়াদেবীকে হিমালয়ের মানস সরোবরে স্নান করিয়ে দিব্য বসন ভূষণ ও মাল্যগন্ধে সাজিয়ে দিলেন।

খানিক দূরেই একটি শুভ্র রজতপর্বতে ছিল একটি সুবর্ণ প্রাসাদ। চারিদিক থেকে পাল দেবগণ মহারাজা পুনঃপালঙ্কসহ দেবীকে সেই প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে দিব্যশয্যায় শুইয়ে দিল।

ভিক্ষুদের অন্যতম বাৎসরিক আচার বর্ষাবাস শুরু হয় আষাঢ়ী পূর্ণিমাতে। শেষ হয় আশ্বিনী পূর্ণিমাতে।

আজ থেকে তিন মাসব্যাপী বর্ষাবাস পালনের মাধ্যমে প্রত্যেক বিহারের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা শীলে অধিষ্ঠিত হয়ে একই বিহারে অবস্থান করবেন।

বর্ষাবাস শেষে ভিক্ষুরা ধর্মপ্রচারে বেরিয়ে পড়বেন। এরপর প্রত্যেক বিহারে বিহারে অনুষ্ঠিত হবে কঠিন চীবর দান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here