সীতাকোট বিহার জানা অজানা তথ্য

0
217

লেখক : শিমুল বড়ুয়া

খ্রিস্টীয় ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বাংলাদেশে যে কয়টি বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হয়েছিল তার মধ্যে একটি হচ্ছে সীতাকোট বিহার।

এদেশে ধ্বংস হিসেবে আবিষ্কৃত বিহার গুলোর মধ্যে এটিই প্রাচীনতম।

দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর রেল স্টেশন থেকে বিশ মাইল দক্ষিণে চরকাই-বিরামপুর,

আর চরকাই-বিরামপুর থেকে ৩ মাইল পূর্বে নবাবগঞ্জ থানা সদরের এক মাইল পশ্চিমে ফতেপুর-মারাজ মৌজায় অবস্থিত সীতাকোট বিহার।

এই বিহার নিয়ে একটি আষাঢ়ে গল্প প্রচলিত আছে

 রামায়ণের কাহিনী মতে সীতার দ্বিতীয়বার বনবাসকালে বাল্মীকি মুনির আশ্রয়ে সীতা এক সুন্দর ইমারতে বাস করতেন।

এতদিন সীতাকোট বিহার সীতার বাসস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ১৯৬৮ সালে আধা-সরকারিভাবে এবং ১৯৭২-৭৩ সালে সরকারিভাবে খননকার্যের (অসম্পূর্ণ) পর দেখা যায় সীতার কথিত আশ্রয়স্থলটি একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ।
বিহালটি অতি সহজ সরল স্থাপত্য শৈলীতে দুর্গাকারে নির্মিত। প্রায় বর্গাকৃতির এ বিতারটি পূর্ব-পশ্চিমে ২১৪ ফুট লম্বা, উত্তর-দক্ষিণে ২১২ ফুট চওড়া।

বিহারটির চারিদিকে ছিল পরিখা। পরীক্ষাগুলো বর্তমানে মজে গেলেও সেগুলাের চিহ্ন এখনাে রয়ে গেছে ।

 ৮.৫ ফুট পুরু সীমানা প্রাচীরকে পেছনের দেয়াল হিসেবে ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছে ৪১টি কক্ষ।

বিহারের উত্তর বাহুতে ছিল আটটি কক্ষ, অপর তিন বাহুতে এগারােটি করে কক্ষে ছিল।

 ভিক্ষুদের আবাস-পঠন-পাঠন আর আরাধনার জন্য নির্মিত কক্ষগুলোর পাকা মেঝে এখনো অটুট আছে।

কক্ষগুলাের আয়তন এক ছিল না। বেশিরভাগ কক্ষের আয়তন ছিল ১১.৫ ফুট x ১১ ফুট, আবার কোন কোন কক্ষের আয়তন ২২ ফুট x ১১ ফুট।

কক্ষগুলাের মাঝের দেয়াল একই মাপের নয়; কোনটি প্রায় ১৩ ফুট পুরু, আবার কোনটি ৪ থেকে ৫ ফুট পুরু।

এতকাল পরেও পেছনের সীমানা দেয়ালের উচ্চতা ৪ ফুট থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত টিকে আছে। এ দেয়ালের বাইরের দিকে কিছুদূর পর পর ৫ ইঞ্চি পরিমাণ বহির্মুখী উদগত

অংশ এখনাে আছে, যা বিহারের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

ময়নামতির শালবন এবং রাজশাহীর পাহাড়পুর বিহারের মত এ বিহারে কোন কেন্দ্রীয় মন্দির ছিল না। তবে পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম ব্লকের ঈষৎ বড় ৩টি কক্ষ মন্দির রূপে

ব্যবহৃত হতাে মনে হয়। দক্ষিণ ব্লকের কক্ষটি ছিল বেশ বড়, খুব সম্ভব সেটি বিহারের প্রধান মন্দির ছিল।

ছাদে যাওয়ার এক মাত্র সিঁড়ি ছিল উত্তর-পূর্ব কোণের কক্ষটিতে, তার কিছু চিহ্ন এখনাে আছে।

অনুমান করা হয় বিহারটি একতল বিশিষ্ট ছিল। বিহারটির ধ্বংসাবশেষ থেকে যেই সমস্ত প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে তা থেকে

প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন বিহারটি দুই পর্যায়ে নির্মাণ এবং এক পর্যায়ে মেরামত করা হয়েছিল।

 এরপরে কোন নির্মাণ বা মেরামত কার্য হয়নি এবং বিহারটি পরিত্যক্ত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী- স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করায় সীতাকোট বিহারে খনন কার্যের পর ব্যাপক

কোন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তবে পাওয়ার মধ্যে আছে দুটি উল্লেখযােগ্য ছােট ব্রোঞ্জের বৌদ্ধ মূর্তি একটি লােকেশ্বর পদ্মপানি, আরেকটি মঞ্জুশ্রী।

ইহা ছাড়া পাওয়া গেছে বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ, ছত্রিশটি লােহার পেরেক, খিল, নানা ধরনের দোয়াত, নানা ধরনের মাটির পুতুল, মাটির তৈরি নকশা করা মাছ, পদ্মফুল অংকিত আঠারােটি ইট, ছাচে ঢালা নকশা করা সাঁইত্রিশ ইট, ছয়টি লােহার রিং,

 বাঘসহ অন্যান্য পশুর পায়ের চিহ্ন আঁকা তিনটি ইট ইত্যাদি। কোন তাম্রলিপি, শিলালিপি অথবা কোন পােড়ামাটির চিত্রফলক পাওয়া যায় নি।

এই বিহারের অতি সাধারণ নির্মাণ কৌশল ও প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী থেকে ধারণা করা যায় বিহারটি খুব সম্ভব পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত হয়।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মাটি খনন করে যে কয়টি বিহারের ধ্বংসাবশেষ,

আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে সীতাকোট বিহার সবচেয়ে প্রাচীন বলে ধারণা করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here