“ঠেগরপুনি বুড়াগোসাইর মন্দির” বৌদ্ধদের অন্যতম তীর্থভূমি

0
378
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ঠেগরপুনি বৌদ্ধদের অন্যতম তীর্থভূমি। ঠেগরপুনি প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের প্রাণকেন্দ্র। তিনটি খালের ধারাবেষ্টিত অনিন্দ্য সুন্দর এক জনপদ।

ঠেগরপুনি বুড়াগোসাইর ইতিহাস

শান্ত, সুনিবিড়, সবুজে ঘেরা এই ছোট্ট গ্রামটি যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা একটি ছবি। যার সম্মুখভাগেই আছে বিস্তৃত একটি বিল-বগাহারা।
কথিত আছে, শ্রীমতি আর চানখালী খালের সংযোগস্থলের বাঁকে একটি পুকুর ছিল এবং ওই বাঁককে ঘিরেই এই জনপদের নাম হয়েছে ঠেগরপুনি’ আর ঠেগরপুনির কথা বলতে গেলেই পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণে আসে পূজ্য বুড়াগোসাই এর পবিত্র নাম।
 যে বুড়াগোসাইর কারণেই ছোট্ট ঠেগরপুনি গ্রামের এত বিস্তৃত ও ঐশ্বর্য্যময় পরিচয়। যার কারণে এই গ্রামটি হয়ে ওঠেছে বাংলাদেশী বৌদ্ধদের পবিত্র ও অন্যতম তীর্থভূমি।
শতাব্দীকাল ধরে এই বুড়াগোঁসাই সমগ্র বৌদ্ধ জাতির মনোমন্দিরে ভক্তিপূর্ণ অর্ঘ্যে, বিনম্র শ্রদ্ধায় পূজিত হয়ে আসছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য পূণ্যার্থী নিজ নিজ মনোবাসনা নিয়ে আসেন প্রতিদিন বুড়াগোসাইর আশীর্বাদ নিতে। ঠেগরপুনির বুড়াগোসাইর ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক কোন সন, তারিখ পাওয়া যায়নি।

‘সদ্ধর্ম রত্নাকর’ গ্রন্থ থেকে ঠেগরপুনি

শ্রদ্ধেয় ধর্মতিলক মহাস্থবির ও শ্রদ্ধেয় বীরেন্দ্র মুৎসুদ্দী অনুদিত ‘সদ্ধর্ম রত্নাকর’ গ্রন্থ থেকে ঠেগরপুনি বুড়াগোঁসাই সম্পর্কে কিছুটা জানা যায়।
ঠেগরপুনি ধর্মাচরণ বিহার
এতে আছে ছান্ধমা নামে এক ব্যক্তি মগধ দেশ থেকে এসে প্রথমে আকিয়াবের ছান্ধমা পাহাড়ে উপনিবেশ স্থাপন করেন। তাঁর নামানুসারে সেই পাহাড়ের নাম ছান্ধমা নামে আজও পরিচিত।
 সেই আদি পুরুষ ছান্ধমার চেন্দি ও রাজমঙ্গল নামে দু’জন ছেলে ছিলেন। চেন্দি গৃহী ছিলেন এবং রাজমঙ্গল ভিক্ষুধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
 গৃহী চেন্দির পুত্র কেয়কচু মগধবাসী দীপঙ্কর মহাস্থবিরের শিষ্য সরভূ মহাস্থবিরের নিকট ভিক্ষুত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ভিক্ষুনাম হয়েছিলো চন্দ্ৰজ্যোতি।
চন্দ্রজ্যোতি ব্রহ্মদেশের মৌলমেইনে ধর্ম-বিনয় অধ্যয়ন করে দেশে ফেরার সময় ব্রহ্মদেশের দশজন ভিক্ষুসহ একটি চক্রাসন, তিনটি বুদ্ধমূর্তি ও কয়েকখন্ড বুদ্ধাস্থি এনেছিলেন। মূর্তিগুলোর শিরের ওপর বুদ্ধের শারীরিক অস্থিধাতু স্থাপন করেন।

সেই বুদ্ধমূর্তিগুলোর আনয়নের সুবিধার জন্য তিন টুকরা অবস্থায় আনীত হয়েছিলো বলে মূর্তিগুলো ত্রিভঙ্গ মূর্তি নামে কথিত।

হাইদগাঁও থেকে ঠেগরপুনি
সদ্ধম রত্নাকরে আরো বর্ণিত আছে যে, ঠেগরপুনিতে পূর্বে লোকবসতি ছিল না।
হাইদগাঁওস্থ বৌদ্ধ জমিদার হাইডমজার পূর্বপুরুষ ছাদ্রপ্রু নামের জৈনক ব্যক্তি ব্যাঘ্র শিকার করে ঐ স্থান মনুষ্য বাসের উপযোগী করেন।
 কালক্রমে তারা হাইদগাঁও থেকে এসে ঠেগরপুনিতে বসতি স্থাপন করেন।
 ক্রমে ঠেগরপুনিতে লোকালয় গড়ে ওঠে। চন্দ্রজ্যোতির পিতৃব্য রাজমঙ্গল মহাস্থবিরও বগাহারা অর্থাৎ ঠেগরপুনিতে বিহার তৈরি করে বাস করছিলেন।
তিনি বুদ্ধগয়া হতে বোধি চারা এনে সেখানে রোপন করেছিলেন। তার উত্তর পার্শ্বে একটি কাঠের ঘর নির্মাণ করে বোধি মন্ডপ স্থাপন করেছিলেন। তার অদূরে ছান্ধমা চেন্দির সাহায্যে একটি দীঘি খনন করেছিলেন।
উক্ত কাঠের ঘরে চন্দ্রজ্যোতি আনীত ত্রিভঙ্গ বুদ্ধমূর্তিগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
সেই কাঠের ঘর ভগ্নাদশায় পতিত হলে মূর্তি অদৃশ্য হয়ে যায়। অতঃপর সুদীর্ঘকাল পর বাক্খালীর স্বর্গীয় শ্রীধন বড়ুয়ার স্ত্রী নীলাকুমারীর উপর স্বপ্নাদেশ হয় যে,
 “আমি বুদ্ধমূর্তি, বৌদ্ধগণের পূজ্য, তুমি নিধিকুন্ডসহ আমাকে উদ্ধার কর এবং চৈত্য প্রস্তুত করে আমাকে স্থাপন কর।” 
নীলাকুমারী স্বপ্নাদেশ অনুসারে নিধিকুন্ডসহ মূর্তি উদ্ধার করলেন এবং করল নিবাসী ভগ্নিপুত্র আরাধন মহাস্থবিরকে পরবর্তী কার্যভার সমর্পন করেন।
তিনি বিহার নির্মাণ করে সেই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকে মূর্তিটির নাম হল বুড়াগোঁসাই। অতীতে মূর্তিটি ত্রিভঙ্গ ছিলো। তার মধ্যাংশ পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে যা আছে, তার উপরের অংশ এবং নিম্নাংশের সংযোগ মাত্র। এই বিহার ও মূর্তিটি ১৮৫৫ খ্রিষ্ঠাব্দের মাঘী পূর্ণিমা দিনে উৎসর্গ করা হয়।

ঠেগরপুনি বুড়াগোঁসাইর মেলা

সেই থেকেই মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে সপ্তাহব্যাপী বিরাট মেলার সূচনা হয়। এই মেলাটি ঠেগরপুনি বুড়াগোঁসাইর মেলা ঠেয়া পৈয়অর মেলা নামে আজ অবধি পরিচিত।
মহামুনি মেলার পরে এটিই বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা।
পূর্বে এই ঠেগরপুনি বুড়াগোসাইর মেলা সপ্তাহব্যাপী চলত। বর্তমানে এটি ৪ ৫দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত জনপদের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিতে
মেলা প্রাঙ্গণ প্রতি বছর মুখর হয়ে উঠে বিহারের সামনের বিশাল মাঠ জুড়ে বসে হরেক রকম ভ্রাম্যমান দোকান।
 পুকুরের চার পাড়েও বসে নানা দ্রব্যের সমাহারে অসংখ্য দোকান পাট এ  বিকিকিনি চলে সকাল থেকে রাত অবধি।
পল্লী গ্রামের হারিয়ে যাওয়া কুটিরশিল্প, মৃৎশিল্প, বাঁশ ও বেতের শিল্প, তাঁতশিল্প, কারুশিল্প ও পাটজাত দ্রব্যের বিক্রয় ও বিপণন হয় মহাসমারোহে।
আশেপাশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও এই মেলার অপেক্ষায় থাকেন বছর ধরে।
তাঁরাও মহা উৎসাহে মেলায় আসেন ঘরের প্রয়োজনীয় এসব সামগ্রী ক্রয় করতে।
এছাড়া মেলায় শুঁটকি মাছের দোকান নিয়েও বসেন শুঁটকি ব্যবসায়ীরা।
 সকল সম্প্রদায়ের শিশু-কিশোর, যুব-যুবতী, প্রৌঢ়-বৃদ্ধরাও এই দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরে বেড়ায় মহা উৎসাহে, আনন্দ ও উদ্দীপনায়।
 বুড়াগোঁসাইর আশীর্বাদপুষ্ট হতে প্রতিদিনই পূণ্যার্থীগণ আসেন। কেউবা অন্নপ্রাশন করাতে, কেউবা প্রব্রজ্যা অনুষ্ঠান করতে, কেউবা অন্য মনোবাসনা নিয়ে।
বৈশাখী পূর্ণিমা এবং অন্যান্য পূর্ণিমা-অমাবস্যা তিথিতেও যেন ছোটখাটো মেলা বসে যায় বুড়াগোসাইর বিহারকে ঘিরে।
কথিত আছে- বুড়াগোসাইর কাছে একমনে ভক্তিপূর্ণ চিত্তে কেউ কিছু চাইলে, তার মনোবাসনা পূর্ণ হয়। বর্তমানে এই বিহারের নাম “ঠেগরপুনি ধর্মাচরণ বিহার”।
বিহারের অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন কর্মবীর ভদন্ত সংঘবোধি মহাথেরো।
তিনি এ বিহারের বিবিধ উন্নয়নকার্য সম্পন্ন করেছেন।
 বোধিমন্ডপসহ নির্বাণশয্যা স্থাপন করেছেন বিহারের দক্ষিণ সম্মুখভাগে।
প্রক্রিয়াধীন আছে সীবলী ও উপগুপ্ত ভান্তের মূর্তি স্থাপনের কাজ।
 এছাড়াও বিহারের আরো অনেক উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হয়েছে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে।
পূজ্য বুড়াগোসাইর আশীর্বাদপুষ্ট এই গ্রাম তার ঐতিহ্য ও কৃষ্টির সমন্বয়ে বাংলাদেশের সমগ্র বৌদ্ধ জনগোষ্ঠি তথা বিশ্বের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে আরো ঐতিহ্যমন্ডিত হোক।
 বুড়াগোঁসাইর আশীর্বাদের সমগ্র মানবজাতি তথা সমস্ত প্রাণীকুল সুখী হোক, দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করুক।
সুজয় বড়ুয়া চৌধুরী
শরণ তৃতীয় প্রকাশ হতে সংগৃহীত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here